এই লেখায়
ঢাকার অফিসপাড়ার একটা সাধারণ দিনের ছবিটা আন্দাজ করা কঠিন নয়। সকালে জ্যামের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ, তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা, দুপুরে ডেস্কেই তড়িঘড়ি করে খাওয়া, আর সন্ধ্যায় আবার সেই জ্যাম ঠেলে বাড়ি ফেরা। দিনের শেষে কোমর-পিঠ যদি ‘উফ্’ বলে ওঠে, তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে, বলুন?
খবরটা কিন্তু ভালো, ভাই। ডেস্কে বসে কাজ করার দরুন যে পিঠব্যথা, তার বেশির ভাগই গুরুতর কিছু নয়; আর রোজকার ছোটখাটো অভ্যাসই সেখানে বড় ফারাক গড়ে দিতে পারে। মোহাম্মদপুরের সালামাহ কেয়ারের ফিজিওথেরাপি টিম এই লেখায় এমন সাতটি অভ্যাসের কথা বলছে, যা এই সপ্তাহ থেকেই শুরু করা যায়। সঙ্গে থাকছে সেইসব বিপদ-সংকেতের কথাও, যেগুলো দেখলে আর গড়িমসি না করে বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হয়।
#বসলে পিঠে ব্যথা হয় কেন?
বসে থাকাটা নিজে কোনো অপরাধ নয়। বিপদ হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে আটকে থাকা। একটানা নড়াচড়া না করলে মেরুদণ্ডকে ধরে রাখা পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে, জয়েন্টগুলো আড়ষ্ট হয়ে আসে, আর কশেরুকার মাঝখানের ডিস্কগুলো পায় কম নড়াচড়া। তার ওপর যদি জোটে ঝুঁকে-পড়া ভঙ্গি, নিচু হয়ে থাকা পর্দা আর পিঠের ঠেকনাহীন চেয়ার, তবে চাপ জমতেই থাকে, ঠিক যেভাবে ছোট ছোট খরচ জমে মাসের শেষে পকেট ফাঁকা করে দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, কোমর বা নিচের পিঠের ব্যথা পৃথিবী জুড়ে মানুষের কাজে অনুপস্থিত থাকার অন্যতম বড় কারণ, আর সক্রিয় থাকাই এই ব্যথা সামলানোর একটি মূল কথা। অর্থাৎ বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা নয়; নড়াচড়াই সাধারণত পথ।
#অভ্যাস ১: প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটে বসে থাকাটা ভেঙে দিন
এটাই সবচেয়ে কাজের অভ্যাস। লম্বা বিরতির দরকার নেই। উঠে দাঁড়ান, পানি আনতে হেঁটে যান, এক মিনিট শরীরটা টান করে নিন, তারপর আবার বসুন। ফোনে বা কম্পিউটারে একটা নীরব টাইমার দিয়ে রাখুন, যতদিন না কাজটা আপনার স্বভাব হয়ে যায়। চেয়ারকে এটুকু বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে সে আপনার স্থায়ী ঠিকানা নয়।
#অভ্যাস ২: দুই মিনিটে চেয়ার আর ডেস্ক গুছিয়ে নিন
দামি এরগোনমিক চেয়ারের জন্য হা-পিত্যেশ করতে হবে না। শুধু এই কয়েকটা জিনিস দেখে নিন:
- চেয়ারের পেছনে ঠেস দিয়ে বসুন, যাতে কোমরের নিচের অংশ চেয়ারে লাগে। দরকার হলে একটা ছোট তোয়ালে বা কুশন গুটিয়ে কোমরের পেছনে দিন।
- পা দুটো মেঝেতে সমতলে রাখুন, হাঁটু প্রায় কোমরের সমান উচ্চতায়। পা ঝুলে থাকলে এক গোছা কাগজ বা একটা ফুটরেস্ট ব্যবহার করুন।
- পর্দার ওপরের কিনারা চোখের প্রায় সমান উচ্চতায় আর এক হাত দূরে রাখুন। ল্যাপটপ হলে বইয়ের ওপর তুলে নিন, পারলে আলাদা কিবোর্ড ব্যবহার করুন।
- কনুই শরীরের কাছাকাছি রাখুন, আর সেটা প্রায় সমকোণে ভাঁজ থাকুক।
#অভ্যাস ৩: মেরুদণ্ডকে একটু নড়াচড়া করান
দিনে দুই-তিনবার কয়েকটা হালকা নড়াচড়া করুন, যাতে মেরুদণ্ড সচল থাকে:
- বসে ক্যাট-ক্যামেল: সোজা হয়ে বসুন, দুই হাত হাঁটুর ওপর রাখুন, তারপর আস্তে আস্তে পিঠ গোল করুন, আবার বাঁকিয়ে দিন। ১০ বার করুন।
- দাঁড়িয়ে পিঠ পেছনে বাঁকানো: দুই হাত কোমরের নিচের অংশে রাখুন আর সামান্য পেছনে হেলুন, কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকুন। ৫ বার করুন।
- বসে মোচড়ানো: শরীরের ওপরের অংশ আলতো করে দুই পাশে ঘোরান, প্রতি পাশে ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন।
ধীরে ধীরে করবেন, আর কোনো কিছুতে তীক্ষ্ণ ব্যথা হলে থেমে যাবেন। ব্যায়াম মানে তো আর পাল্লা দেওয়া নয়!
#অভ্যাস ৪: রোজ হাঁটুন
আড়ষ্ট পিঠের জন্য হাঁটা সম্ভবত সবচেয়ে ভালো ওষুধ, আর এ ওষুধের কোনো দাম নেই। হাঁটলে মেরুদণ্ড আলতো করে নড়ে, সহনশক্তি বাড়ে, মনও হালকা হয়। বেশির ভাগ দিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্য রাখুন, একটানা হোক বা ভেঙে ভেঙে। মাগরিবের পর বা ফজরের পর একটু হাঁটা, কিংবা দুপুরের খাবারের ফাঁকে জোর কদমে কিছুক্ষণ চলা, সবই হিসাবে ধরা হবে।
#অভ্যাস ৫: পেট আর কোমরের পেশি শক্ত করুন
শক্ত পেশি মেরুদণ্ডের বোঝা ভাগ করে নেয়। ঘরে বসেই করা যায় এমন দুটি সহজ ব্যায়াম, সপ্তাহে তিন দিন:
- গ্লুট ব্রিজ: চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করুন। কোমর এমনভাবে তুলুন যাতে কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর একটা সরলরেখায় আসে, ৩ সেকেন্ড ধরে রেখে নামিয়ে আনুন। ১০ বার করুন।
- বার্ড-ডগ: হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে একটি হাত ও উল্টো দিকের পা সামনে-পেছনে টান করুন, ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর দিক বদলান। প্রতি দিকে ৮ বার করুন।
আগে পিঠে আঘাত পেলে বা অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে, কোন ব্যায়াম আপনার জন্য ঠিক, তা আগে একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে দেখিয়ে নিন।
#অভ্যাস ৬: ঘুম আর তোশকের যত্ন নিন
খুব নরম তোশক, কিংবা উপুড় হয়ে ঘুমানো, সকালে পিঠকে আড়ষ্ট করে দিতে পারে। বেশির ভাগ মানুষের জন্য কাত হয়ে হাঁটুর মাঝখানে বালিশ নিয়ে শোয়া, অথবা চিত হয়ে হাঁটুর নিচে ছোট বালিশ দিয়ে শোয়া বেশি আরামদায়ক। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ের চেয়ে উঠে যদি বেশি আড়ষ্ট লাগে, তবে তোশক আর শোয়ার ভঙ্গিটা একবার ভেবে দেখা ভালো।
#অভ্যাস ৭: দুশ্চিন্তা সামলান, আর পানি পান করুন
দুশ্চিন্তা এলে আমরা টেরও পাই না, কখন ঘাড়, কাঁধ আর পিঠের পেশি টান করে বসে আছি। কয়েকটা ধীর শ্বাস, একটু হাঁটাহাঁটি, কিংবা ডেস্কেই এক মুহূর্তের জিকির আর নীরবতা সেই টান ঢিলে করতে সাহায্য করতে পারে। সারাদিন যথেষ্ট পানি পান করলেও শরীর আরাম পায়, মনও সতেজ থাকে।
#কখন ফিজিওথেরাপিস্ট বা ডাক্তার দেখাবেন?
উপরের অভ্যাসগুলো মানলে বেশির ভাগ পিঠব্যথা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমে আসে। তবে ব্যথা বারবার ফিরে এলে, দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে, দৈনন্দিন কাজে বাধা দিলে, কিংবা কোন ব্যায়াম আপনার জন্য নিরাপদ তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ফিজিওথেরাপিস্টকে দেখান। আমাদের ফিজিওথেরাপি সেবার মাধ্যমে আমাদের টিম মূল্যায়ন করে আপনার জন্য একটি ব্যক্তিগত পরিকল্পনা দেয়।
ব্যথার কারণে যাতায়াতই কঠিন হয়ে পড়লে আমাদের হোম ফিজিওথেরাপি টিম ঢাকায় আপনার বাসায় গিয়ে সেবা দিতে পারে।
#সবকিছু একসঙ্গে ভাবলে
সব এক দিনে করে ফেলতে হবে না। শুরু করুন দুটি অভ্যাস দিয়ে: প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটে একটা নড়াচড়ার বিরতি, আর দুই মিনিটের চেয়ার-গোছানো। তারপর পরের কয়েক সপ্তাহে যোগ করুন রোজের হাঁটা আর কয়েকটা শক্তি-ব্যায়াম। ছোট ছোট পদক্ষেপ, রোজ রোজ, বছরের পর বছর পিঠকে বাঁচিয়ে রাখে। কচ্ছপ কিন্তু এভাবেই দৌড়ে জেতে।
ব্যক্তিগত পরিকল্পনা চাইলে সালামাহ কেয়ার টিমের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
সারাদিন বসে থাকা ভালো, নাকি দাঁড়িয়ে থাকা?
কোনোটাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভালো নয়। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঘন ঘন ভঙ্গি বদলানো: দিনের মধ্যে বসুন, দাঁড়ান, হাঁটুন, শরীর টান করুন। স্ট্যান্ডিং ডেস্ক কাজে দিতে পারে, কিন্তু তখনই, যখন আপনি নড়াচড়াও চালিয়ে যান।
পিঠে ব্যথা হলে কি বিছানায় বিশ্রাম নেব?
বেশির ভাগ পিঠব্যথায় লম্বা বিছানা-বিশ্রামের চেয়ে ছোট ছোট হাঁটার মতো হালকা চলাফেরা সেরে উঠতে বেশি সাহায্য করে। দরকার হলে অল্প সময় বিশ্রাম নিন, তারপর আরাম অনুযায়ী স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরুন। ব্যথা তীব্র হলে বা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পিঠব্যথায় কি স্ক্যান করানো দরকার?
বেশির ভাগ পিঠব্যথায় স্ক্যান লাগে না। দুর্বলতা, অসাড়ভাব, সাম্প্রতিক আঘাত, বা না-কমা উপসর্গের মতো সতর্কসংকেত থাকলে তবেই সাধারণত স্ক্যানের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরীক্ষার পর ফিজিওথেরাপিস্ট বা ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিতে পারবেন।
ডেস্কে কাজ করার পিঠব্যথা সাধারণত কতদিন থাকে?
সক্রিয় থাকলে আর বসার ব্যবস্থা ঠিক করলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যথা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমে আসে। ব্যথা দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে, বারবার ফিরে এলে, কিংবা পা বেয়ে নেমে গেলে পেশাদার মূল্যায়ন করিয়ে নেওয়া ভালো।
সূত্র ও আরও পড়ার জন্য
চিকিৎসাবিষয়ক দাবিত্যাগ। এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়। কোনো উপসর্গ, ব্যথা বা স্বাস্থ্য-দুশ্চিন্তা থাকলে অনুগ্রহ করে চিকিৎসকের কাছে যান। জরুরি অবস্থায় ৯৯৯-এ কল করুন।
ঢাকায় ফিজিওথেরাপি দরকার?
মোহাম্মদপুরে সালামাহ কেয়ার টিমের সঙ্গে কথা বলুন। আমরা মন দিয়ে শুনব, আপনার সামনে থাকা বিকল্পগুলো স্পষ্ট করে বোঝাব, আর সঠিক সেবার পথ দেখিয়ে দেব।




